ভারতে শিশুদের মধ্যে বাড়ছে ডায়াবেটিস
মেডিভয়েস ডেস্ক: পার্থ শর্মার বয়স মাত্র ১৫। সে ডায়াবেটিসের রোগী। সময়মতো ইনসুলিন না নিলে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যাবে, একথা সে জানে৷ এর ফল কী হতে পারে, সেটাও তার জানা৷ তাই স্কুল হোক বা বাসায়, ঠিক সময়ে দিনে পাঁচবার ইনসুলিন নেয় পার্থ। তার পরিবারে আরও অনেকেরই আছে এই রোগ৷
মুম্বাইয়ের বাসিন্দা পার্থ বলেন,‘আমি ঠিক সময়ে ইনসুলিন না নিলে আমার তেষ্টা পায়, আমি অচেতন হয়ে পড়ি৷ এক বছর ধরে আমি নিয়ম মেনে চলছি৷ আমার শরীর বোঝে কখন আমায় ইনসুলিন নিতে হবে৷’
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ দিব্যা সিং বলেন, যে শহর ও মফস্বল, দুই জায়গাতেই বাড়ছে শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার। করোনার পর ‘টাইপ ২’ ডায়াবেটিস আরও বেশি করে দেখা যাচ্ছে ৮ থেকে ১০ বছর বয়েসি শিশুদের মধ্যে৷ এর পেছনে রয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে কম চলাফেরা বা খেলাধুলা করা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও পারিবারিক ইতিহাসও৷
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, আগে বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যেত ‘টাইপ ১’ ডায়াবেটিস৷ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ‘টাইপ ২' ডায়াবেটিসও৷
অল্প বয়সে ডায়াবেটিস থাকলে পরে ভবিষ্যতে কিডনি, হার্ট বা চোখের সমস্যাও দেখা দিতে পারে৷
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ডায়াবেটিস একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা৷ প্রাথমিক ধাপে রোগ চিনতে পারা, তার দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা ও জটিলতা প্রতিরোধের জন্য দরকার বহুমুখী পরিকল্পনার৷
টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস
প্রথম ধরনের ডায়াবেটিসকে চিকিৎসকেরা চেনেন ‘জুভেনাইল’ বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ডায়বেটিস হিসাবে৷ এই ধরনের ডায়াবেটিসে অল্প বয়েসিদের শরীর নিজে থেকে ইনসুলিন তৈরি করতে পারেনা বলে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যায়৷
২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে, সেই বছর ভারতে প্রায় দশ কোটি মানুষের মধ্যে ছিল ডায়াবেটিস এবং আরও ১৪ কোটি মানুষ ছিলেন প্রি-ডায়বেটিক, অর্থাৎ ডায়াবেটিসের আগের ধাপে৷
আইসিএমআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ) সেই একই গবেষণায় এটাও বলে যে ২০২১ সালে ১৪ বছরের কম বয়েসিদের মধ্যে ৯৫হাজার৬০০জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত৷ এছাড়া প্রতি বছর, নতুন করে আরও ১৫ হাজার ৯০০জন আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানায় তারা৷
কিন্তু রক্তে চিনির মাত্রা খুব বেশি হলে ও ডায়াবেটিস দীর্ঘমেয়াদী হলে তা ‘টাইপ ২’-তে পরিণত হয়৷ শিশুদের মধ্যে এই ধরনের ডায়াবেটিস বড়দের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর৷ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজন, জীবনযাপন ও খাদ্যাভাস এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷
অজ্ঞতা ও লজ্জার বিরুদ্ধে লড়াই
ডায়াবেটিসকে ঘিরে ভারতে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরনের সামাজিক ট্যাবু ও অজ্ঞতা৷ অনেক সময় বাবা-মায়েরা লজ্জায় স্কুল কর্তৃপক্ষকে তাদের বাচ্চার ডায়াবেটিসের কথা বলেন না৷ গণপরিসরে ইনসুলিন নিতেও রয়েছে ট্যাবু৷
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ সুপর্ণা ঘোষ-জেরাঠের মতে, শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিসের পেছনে রয়েছে বেশি মাত্রায় প্রক্রিয়াজাত চর্বি, চিনি ও লবণ খাওয়ার অভ্যাস৷
তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে সব বয়েসেই ভারসাম্যযুক্ত খাবার খেতে হবে৷ শিশুদের বেশি করে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো উচিত৷’
ভারতের উত্তর ও দক্ষিণে সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিসের হার৷ ভারতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে রোগীদের নিজের জীবনের রাশ নিজেকেই নিতে হবে, এমনটা মনে করেন ভারতের গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনিকা অরোরা৷
তিনি বলেন, ‘ডায়াবেটিস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা ও তা মোকাবিলা করা জানতে হবে৷ এছাড়া রোগীদের প্রয়োজন সঠিক সময়ে ওষুধ ও ইনসুলিন৷ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও রোগীর জ্ঞান বাড়ানো ও তার হাতে নিয়ন্ত্রণের রাশ তুলে দেওয়া শেখাতে হবে৷’
ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তুলনায় শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার কম দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটা আসলে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবার ফল৷ কারণ সেখানে সঠিকভাবে যাচাই করা হয়না বলে অজানা থেকে যায় শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিসের বাস্তব চিত্র৷
ভারতে সবার কাছে সমানভাবে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ৷ দিল্লির এইমস বা অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিকাল সায়েন্সেসের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ নিখিল টান্ডান বলেন, ‘আমরা আশা করছি এক সময় টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সকল শিশুদের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনসুলিন পৌঁছাতে আমরা সচেষ্ট হব৷’
২০২২ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সভায় ভারতকে মোট পাঁচটি ডায়াবেটিস বিষয়ক লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়৷ ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করবে ভারত৷ সূত্র- ডয়চে ভেলে
এফসিপিএসে নতুন নীতিমালা
‘মেধাক্রমের ভিত্তিতে ভাতা সীমাবদ্ধ হলে প্রশিক্ষণার্থীরা আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়বেন’